গল্পঃ হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা

 

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা

শহরটার নাম হামেল্ন৷ সবাই চেনে হ্যামিলন নামে৷ ছোট্ট, সাজানো, সুন্দর শহর হ্যমিলন৷ সেই শহরের মানুষের খুব দু:খ৷ সেখানে যেন ইদুর বন্যা হয়েছে৷ বলছি ১২৮৪ সালের কথা৷ হাজারে হাজারে ইঁদুর৷ এখানে সেখানে৷

ঘরের মধ্যে যাও সেখানেও ইঁদুর৷ এই ধরো কোন বাচ্চা স্কুলে যাবে, ব্যাগ গোছাচ্ছে, দেখা গেল ঐ ব্যাগের মধ্যে গোটা পাঁচেক ইঁদুর ছানা৷ কিংবা স্কুলের খেলার মাঠে শিশুদের পা খামচে ধরছে ইঁদুর৷ কি যে যাচ্ছেতাই অবস্থা! শহরের মেয়র পড়েছেন ভারি বিপদে৷ নগর পিতার ঘুম নেই৷ কি করবেন তিনি…

এমনি এক ইঁদুর দিনে হ্যামিলনে এসে পৌঁছালো আজব এক লোক৷ লোকটির পরনে খাটো নানান রঙ্গের আলখাল্লা,

মাথায় চোঙ্গার মতো উপরে উঠে ঝুলে পড়া টুপি৷ হাতে লম্বা এক বাঁশি৷ আহা কি সুন্দর করেই না বাঁশি বাজায় লোকটি…৷

শহরের মধ্যখানে মেয়রের অফিস৷ এক সময় সেখানকার রোদে গা জুড়াতো মানুষ ৷ আজ আর সেই অবস্থা নেই৷ লোকজন ঘরে কোনভাবে দিন কাটায়৷ অফিস আদালতের কাগজপত্র কেটে কুটে একাকার করে দিচ্ছে ইঁদুর আর ইঁদুর ছানারা৷ শহরের গণ্যমান্য লোক তাই বসেছেন সভায়৷ কি করা যায় সেই চিন্তায় সকলের কপালে পড়ে গেছে ভাঁজ৷ ঐ সভায় এসে পৌছালো সেই অদ্ভুত বাশিওয়ালা…

আমি আপনাদের সমস্যা সমাধান করে দিতে পারি৷ আমি হচ্ছি ইঁদুর শিকারি৷ আমি এই শহর থেকে তাড়িয়ে দিতে পারি সব ইঁদুর৷

মেয়র একটু ভ্রূ কুঁচকে বললেন

বিনিময়ে তুমি কি চাও?

তখনি সমস্বরে সেখানে উপস্থিতরা বলে উঠলেন…. তুমি যা চাও আমরা তাই দেবো৷ টাকা চাও, সোনা চাও, জমি চাও, ঘর চাও, বাড়ি চাও সব তোমাকে দেবো, কেবল আমাদের রক্ষা করো৷

লোকটি একটু হাসলো৷ তারপর বাইরে বের হয়ে নিজের রঙিন আলখাল্লাটার মধ্য থেকে দারুণ একটি বাঁশি বের করল….. তারপর সেই বাশি বাজাতে বাজাতে ঘুরতে থাকল হ্যামিলনের পথে৷ সে বাঁশির এক অচেনা সুরের আকর্ষণে শহরের হাজার হাজার ইঁদুর দল

বেঁধে ছুটছে লোকটির পেছনে পেছনে৷ নর্দমার গর্ত থেকে, অন্ধকার গলি থেকে, রান্নাঘরের পেছন থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসছে ইঁদুর৷ সুরের সন্মোহনে পাগল যেনো ইঁদুরের দল৷

ঐ শহরের পাশে যে নদী তার নাম ভেজার৷ লোকটি থামলো না৷ ভেজার নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো সে৷ আর তাঁর পিছু অদ্ভুত সুরের মূচ্ছর্নায় আসতে থাকলো ইঁদুরের দল৷ এক সময় বাশিওয়ালার বাঁশির সুর থেমে গেলো৷ কি এক চক্রবাঁকে যেন এক উন্মাদনা এসে ভর করলো ইঁদুরের দলে৷ আর সে যেনো উন্মাদনাতেই দল বেঁধে ঝাপিয়ে নদীর জলে…

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা এভাবেই ইঁদুরের কবল থেকে রক্ষা করলো শহরবাসীকে৷ কিন্তু এরপর?

ইঁদুর বিদেয় হবার পর শহরের মেয়র আর শহরের গণ্যমান্য লোকদের কাছে এসে চাইলো তার সম্মানী৷ কিন্তু কি হলো জানো… মেয়র এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা প্রাপ্য সোনাদানা তো দিলই না, আরো বরং ধমকে তাড়িয়ে দিল বাঁশিওয়ালাকে৷

বাঁশিওয়ালা খুবই দু:খ পেলো৷ তার চোখে পানি৷ প্রতিশোধ নেবার বাসনা তার মধ্যে৷ কিছুদিন পর যখন শহরের লোকজন তাদের গীর্জায় প্রার্থনারত, সেই ক্ষুব্ধ, প্রতারিত বাঁশিওয়ালা ফিরে এলো আবার৷

এবার তার মাথায় লম্বা লাল রঙের টোপর৷ গায়ে জড়ানো অদ্ভুত পোশাকটি অনেক লম্বা৷ সেই পোশাক থেকে বের করল সে একটি ছোট্ট বাঁশি৷ সেই বাঁশিটি বেজে উঠলো৷ কিন্তু এবার বাঁশির একেবারেই অন্য সুর৷ সেই সুরে এবার আর ইঁদুর বেরিয়ে এলো না৷ বেরিয়ে এলো শহরের সমস্ত শিশুর দল৷ সুরের মূর্চ্ছনায় বাঁশিওয়ালার পেছনে পেছনে সরু পথ থেকে বড় পথ৷ পাহাড়ের কোল থেকে নদীর কুল পর্যন্ত এগিয়ে যাচ্ছে শিশুর দল৷ এই দলে আছে শহরের মেয়রের আদরের কন্যাও৷ এরপর বাঁশিওয়ালা শিশুদের নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো৷ এই পাহাড়, ঐ নদী, পাশের শহর সব জায়গা খুঁজেও পাওয়া গেলো না সেই শিশুদের৷ পাওয়া গেলে কেবল দুটি শিশুকে৷ মিছিলের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কারণে পিছিয়ে পড়েছিল বলে তাদের ফিরে আসতে হলো৷ তাদের একজন অন্ধ বলে জানতে পারলো না, কোথায় গেল সবাই৷ আরেকজন বোবা বলে জেনেও কিছু বলতে পারলো না…..

এর পর আর কোনদিন দেখা যায়নি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাকে৷

-সমাপ্ত-

Leave a Reply