কিশোর কিশোরীর বয়ঃসন্ধি কাল এবং তাদের স্বাস্থ্যের জন্য আমাদের করণীয়

আদিব (ছদ্মনাম) ক্লাস এইটে পড়ে, বয়স তেরো বছর। বাসাতে মেহমান এসেছে। বাচ্চারা আইসক্রীম খাচ্ছে। আদিবও আইসক্রীম খাওয়ার বায়না ধরলো। মা, ধমক দিয়ে বললো, তুমি কি আর ছোট আছো? আইসক্রীম তো খায় ছোটরা। আদিব চুপ হয়ে গেলো। ঐ দিন বিকেলে মেহমানরা বেড়াতে যাচ্ছে। আদিবও ওদের সাথে যেতে চায়। আদিবের ভাইয়া বললো, দেখছোনা, আমরা সব বড়রা বেড়াতে যাচ্ছি। তুমি ছোট মানুষ হয়ে আমাদের সাথে যেতে চাচ্ছো কেনো? আদিবের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। একই আদিব, অথচ তাকে দুই জায়গায় দুইরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হলো। আদিব ভাবতে থাকে, তাহলে ও নিজে কোন শ্রেণীতে পড়ে। আসলে আদিব এখন বয়ঃসন্ধি কালে আছে। শৈশব কাটিয়ে একটা মানুষ কৈশোরে পা দেয়, তারপর যৌবন। বয়ঃসন্ধি কাল সময়টা মূলত, কৈশোর ও যৌবনের মধ্যবর্তী পর্যায়। কৈশোরের রেশ কাটিয়ে বড়দের কাতারে যাবার মধ্যবর্তী সময়টাকেই মূলত বয়ঃসন্ধি কাল বলে।

কিশোর কিশোরীর বয়ঃসন্ধি কাল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে কৈশোর বলে। এর যে কোনো এক সময়ে বয়ঃসন্ধিকাল আসতে পারে। আমাদের দেশে বয়ঃসন্ধি শুরু হয় ১১ বছর বয়সে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে মেয়েরা দ্রুত বড় হতে থাকে। শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন আসে। এসময় নিজের শারীরিক পরিবর্তনে ছেলে মেয়েরা হীনমন্যতায় ভোগে। শরীর এবং শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের ফলে এসময় ছেলে মেয়েরা নতুন জগতে প্রবেশ করে। তাদের চিন্তা-চেতনায় দেখা দেয় ব্যাপক পরিবর্তন। তারুন্যের নব উদ্দীপনার উদাসীনতায় নিজের প্রতি খেয়াল থাকেনা অনেক ছেলে মেয়েদের। আবার যখন খেয়াল হয়, তখন নিজের কাছেই নিজেকে সমাজের বেমানান বস্তু হিসেবে ধারণা হতে থাকে।

বয়ঃসন্ধিকালে প্রজনন স্বাস্থ্যজ্ঞানঃ

একটি ছেলে যখন শৈশব পেরিয়ে বয়ঃসন্ধি কালে প্রবেশ করে তখন তার পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন তৈরি হতে থাকে। একটি মেয়ে যখন শৈশব পেরিয়ে বয়ঃসন্ধিকালে প্রবেশ করে তখন তার ডিম্বাশয় থেকে প্রজনন কালে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন নিঃসৃত হয়। এসব হরমোনের কারণে বয়ঃসন্ধিতে প্রজননেন্দ্রিয়ের পূর্ণবিকাশ হতে থাকে বলে ছেলেরা মেয়েদের প্রতি এবং মেয়েরা ছেলেদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। এসময় ছেলেমেয়েদের মন মেজাজ খুব ওঠা নামা করে। এই ভালো লাগছে তো পরক্ষণেই আবার খুব খারাপ লাগছে। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে এবং যেকোনো কিছু নিয়ে দ্বিধান্বীত থাকে। এই মনে হয় দারুণ খুশি, কিন্তু একটু পরেই ঘন বিষাদ। এসময় শরীরের নিঃসৃত যৌনহরমোন গুলো কিশোর-কিশোরীর মন মেজাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

বয়ঃসন্ধি কালেই কিশোর-কিশোরীরা প্রজনন ক্ষমতা লাভ করে, তাই এসময় থেকেই প্রজনন স্বাস্থ্য সমন্ধে সঠিক শিক্ষার প্রয়োজন। কিশোর-কিশোরীরা প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক ভাবে জানতে পারলে, সুষ্ঠুভাবে নিজেদের যত্ন নিতে পারবে এবং এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সুস্থ-সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তুলতে পারবে। এসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ, যৌনরোগ সম্পর্কে জানা ও প্রতিরোধ করার জ্ঞান থাকাটা জরুরী।

বয়ঃসন্ধি কালে পারিবারিক ইতিবাচক দৃষ্টি ভঙ্গির প্রয়োজনীয়তাঃ

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সব কিছু এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পারিবারিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কখনোই পরিবর্তন করা যাবেনা। ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে একটা শিশুর পরিপূর্ণ ভাবে বেড়ে উঠার পেছনে, অন্য সবার চেয়ে বেশি গুরুত্ত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার। একটা ছেলে বা মেয়ে বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় অনেক ধরনের পরিবর্তনের শিকার হয়। এইসব শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের কারনেই আমরা একটা ছেলে অথবা মেয়েকে আলাদা করতে পারি। একটা মানুষ বেড়ে ওঠার সময়টাতে তার মনে অনেক ধরনের প্রশ্নের জমা হয়। “অনেক গুলো নাজানা’’ আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আমরা জানি, মানুষ স্বভাব সুলভ ভাবেই, অদেখাকে দেখার ও অজানাকে জানার কৌতূহলী। কিন্তু, অজানাকে জানার আর, অদেখাকে দেখার যুদ্ধে সবাই কি জয়ী হতে পারে? নাকি অনেক ভুল তথ্যের কারনে বয়ঃসন্ধি কাল জয়ের না হয়ে, হয় ভয়ের?

বয়ঃসন্ধি কালে অনেকগুলো অজানা একসাথে এসে, কিশোর-কিশোরী দেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলে। নিজের হঠাৎ এই পরিবর্তনে তারা দিশে হারিয়ে ফেলে এবং নিজেদেরকে অসহায় ভাবতে শুরু করে। পরিবারকেই সেই সময়টাতে তারা সবচেয়ে বেশি কাছে পায় , কিন্তু কারোও কাছে নিজেদের সমস্যার কথা ভয়ে বলতে পারেনা। আমরা বড়রাও তাদেরকে বুঝিয়ে বলিনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যে, তোমার সাথে যা ঘটে যাচ্ছে, সবই প্রাকৃতিক। “ তুমি যে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছো, এটাই স্বাভাবিক, এটাই সৃষ্টির সৃজনশীলতা”। সাহস দিয়ে তাদের বলিনা, আমাদের বেলায়ও এমনটা ঘটে গেছে। পরিবারের কাছে সহযোগিতা না পেয়ে কিশোর-কিশোরীরা কথা বলতে বাধ্য হয় সমবয়সী বন্ধুদের সাথে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা সঠিক জানার চেয়ে ভুল জানে। তাই, পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গ দিবেন।যাতে এসময় তারা একা না থাকে। কারণ বয়ঃসন্ধিতে তারা নিজেদের দারুণ অসহায় ভাবে।

বয়ঃসন্ধি কালের খাদ্য সমাচারঃ

জীবনের এই গুরুত্বপূর্ন সময়ে শরীরের যত্ন নেয়া ও স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খাওয়া খুবই জরুরি। কারণ বয়সন্ধি কালে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের পাশাপাশি খাবারের মানেও পরিবর্তন আসে। কিছুদিন আগে যে খাবার তাদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল, এখন তারা সেসব খাবার দুচোখে দেখতে পারেনা। এ সময় ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সময় মত খাবার না খাওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। ঘরের খাবারের চেয়ে বাইরের খাবারের প্রতি তাদের বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।

এ বয়সী ছেলে মেয়েদের ক্যালসিয়াম, আয়রন, প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেট আছে এরকম খাবার খেতে হবে। বাড়ন্ত বয়স বলে এই সময় প্রোটিনের চাহিদা বেশি থাকে।সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্য তালিকায় সবুজ শাকসবজি, দেশীয় বিভিন্ন ধরণের ফল, ডাল, সিমের বিচি, মাছ, ডিম, দুধ খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। বয়ঃসন্ধির সময় মেয়েদের আয়রনের ঘাটতি এড়াতে খেতে হবে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার।ডিম, ডাল, মাছ, মাংস, কলা ও সবুজ শা্কে (বিশেষত কচুশাক) তা পাওয়া যাবে। কিশোর-কিশোরীদের দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। কিশোর-কিশোরীরা যাতে হিডেন হাঙ্গারে (ভিটামিন-মিনারেলের ঘাটতি জনিত রোগ) না ভোগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

শেষকথাঃ
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “তেরো-চৌদ্দ বছরের মতো, এমন বালাই আর পৃথিবী তেনাই।’’ আসুন, প্রাকৃতিক এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের ধারায় নিজের সন্তান, আশেপাশের আত্মীয় স্বজনদের কাছে ভয়ের এই বিষয়টাকে জয়ের করে তুলতে সহায়তা করি। আপনার, আমার, সবার একটু একটু ইতিবাচক সহযোগিতাই পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসবে।

মোঃ আলমগীর কবীর 
বি.এসসি এবং এম.এ্স,
খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ,
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply