বাংলাদেশের স্বাদুপানির ছোট মাছ পরিচিতি -১

স্বাদুপানির মাছ বা মিঠা পানির মাছ (ইংরেজি Freshwater fish) হচ্ছে সেই ধরনের মাছ যাদের জীবনের কিছু বা সব সময় স্বাদু পানি যেমন, নদী বা হ্রদে বাস করে যেগুলোর লবণাক্ততা ০.০৫% এর কম। এই পরিবেশ, নানাভাবে সামুদ্রিক অবস্থার থেকে পৃথক, সবচেয়ে সুস্পষ্ট পার্থক্য হচ্ছে লবণাক্ততার মাত্রার মধ্যে পার্থক্য। স্বাদু জলে বেঁচে থাকার জন্য, মাছ শারীরবৃত্তীয় অভিযোজনের একটি পরিসীমা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মাছের তালিকা থেকে সব পরিচিত মাছের প্রজাতির ৪১.২৪% স্বাদুপানিতে পাওয়া যায়।

এক সময় বাংলার প্রতিটি জলাশয়(হাওর, বাউর, বিল, খাল, নদী পুকুর ইত্যাদি) ছিল হরেক রকম মাছে ভরপুর। এখন মাছের প্রাপ্যতা আর আগের মতো নেই। আমাদের আগের প্রজন্ম যেসব মাছ দেখেছে সেগুলোর কিছু কিছু আমাদের জন্য বিরল হয়ে গেছে। আমাদের পরের প্রজন্মকে হয়ত ছবি দেখিয়ে বলতে হবে এই মাছটা আমাদের দেশে ছিল, এটার নাম এই মাছ। এই পোষ্টে আমি বাংলাদেশে পাওয়া যায় বা যেত এরকম প্রায় সব মাছ গুলোকে পরিচিত করার চেষ্টা করেছি।একেক মাছ একেক এলাকায় ভিন্ন নামে পরিচিত। মাছ সম্পর্কে সবাইকে ধারনা দিতে এই পোষ্ট আশা করি কাজে দিবে।

মানসম্মত ডায়েট চার্ট, স্বাস্থ্য টিপস এবং পুষ্টিকর খাবারের রেসিপির ভিডিও দেখতে পুষ্টিবাড়ির ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন… ইউটিউব চ্যানেলটিতে প্রবেশ করতে এখানে ক্লিক করুন

কই মাছ

কই মাছ

কই মাছ

কই বাংলাদেশের খুব সুস্বাদু মাছগুলোর অন্যতম। বর্তমানে এটি খুব দামী মাছ হিসাবে পরিচিত। এটি  মিঠা পানির মাছ। সাধারণত নদী, খাল এবং বিলে পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে পুকুরেও চাষ করা যায়। বৈজ্ঞানিক নাম Anabas cobojius। মাছটিকে ইংরেজিতে Gangetic koi বলে। এটি  বাংলাদেশের স্থানীয় মাছ। বাংলাদেশে কই মাছের প্রচুর চাহিদা রয়েছে এবং সুস্বাদু বটে। চাষাবাদ পদ্ধতি পরিবর্তেন মাধ্যে প্রতি বছর প্রচুর কই মাছ উৎপাদন সম্ভব। যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে করবে সতেজ।

কাচকি মাছ

কাচকি মাছ

কাচকি মাছ

কাচকি (বৈজ্ঞানিক নাম Corica) Clupeidae পরিবারের একটি গণের নাম। এগুলো খুব ছোট প্রায় স্বচ্ছ মাছ, যা সচরাচর বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, চীন, প্রভৃতি দেশের নদ-নদী, খাল-বিলে সুলভ। এই মাছ পুকুরে পাওয়া গেলেও বানিজ্যিক ভাবে এর চাষ করা হয় না।

 

 

কাকিয়া মাছ

কাকিয়া মাছ

কাকিয়া মাছ

কাকিয়া, কাইক্কা বা কাক্‌লি নামে পরিচিত, এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, দীর্ঘ চোঙ্গার মত দেহ এবং এর উভয় চোয়ালের অতি দীর্ঘকার ঠোঁট ও তাতে তীক্ষ্ণ দাঁতের সমাবেশ। এদের পিঠের দিকটা কালচে ধূসর ও বুকের দিকে সাদা। বাংলাদেশ এ যে জাতটি পাওয়া যায় সেটি মিঠা পানির জাত। এগুলি লম্বায় ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও থাইল্যান্ড ও ভারতেও এই মাছ পাওয়া যায়। তবে রং ও আকারে কিছু পার্থক্য থাকে। এটি মিঠা পানির মাছ। সাধারণত নদী, খাল এবং বিল এ পাওয়া যায়। তবে পুকুর এ চাষ করা যায় না।

বাতাসি/কাজলি মাছ

বাতাসি বা কাজলি মাছ

বাতাসি বা কাজলি মাছ

বাতাসি মাছ অঞ্চলভেদে বাতাই কিংবা আলুনি নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Pseudeutropius atherinoides। এ মাছটি দৈর্ঘ্যে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। দেহ চ্যাপ্টা, ঘাড়ের নিকট স্বচ্ছ গোলাকার অংশ থাকে। মাছটি স্বাদু পানির হলেও হালকা লবনাক্ত পানিতে কিংবা জোঁয়ার- ভাটাযুক্ত নদীতেও দেখা যায়। এ মাছটিকে বর্তমানে বাজারে খুব কমই দেখা যায়। মাছটির নাম বর্তমানে বাংলাদেশের সংকটাপন্ন মাছের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। কাজলি সচরাচর বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, প্রভৃতি দেশের স্থানীয় মাছ হিসেবে পরিচিত। আইইউসিএন বাংলাদেশ (২০০০) এর লাল তালিকা অনুযায়ী এই প্রজাতিটি বাংলাদেশে আশংকাজনক হিসেবে বিবেচিত।

খলিশা মাছ

খলিশা মাছ

খলিশা মাছ

খলিসা বা খলসে বা চাটা (Trichogaster) হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্থানীয় মাছ। খলিশা মাছ বাংলাদেশের সর্বত্র পাওয়া যায়। গ্রামে-গঞ্জে যারা থাকেন তারা এই মাছ খুব ভালই চেনেন। তাই খাল-বিল বা ডোবায় জন্ম নেয় এই মাছ। খলিশা মাছের দেহের উপরিভাগ সবুজাভ এবং দেহ ডোরাকাটা। খলিশা মাছের প্রধান খাদ্য হলো, মশার শুক ও মূককীট। তাই মশা নিয়ন্ত্রণে খলিশা মাছের ভূমিকা অপরিসীম। এ ছাড়াও এদের খাদ্য তালিকার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে শ্যাওলা বা অ্যালগী (algae)। এরা ডিম পাড়ার মাত্র ১৪-১৫ ঘন্টার মধ্যে পোনা নির্গত হয়। বাংলাদেশে খলিসা মাছের ৩টি প্রজাতি পাওয়া যায়; সেগুলো হচ্ছে চুনা খইলশা, বড় খইলশা এবং লাল খইলশা।

টাকি মাছ

টাকি মাছ

টাকি মাছ

টাকি বা লাটি বা ওকন বা ছাইতান (বৈজ্ঞানিক নাম:Channa punctata) (ইংরেজি: Spotted Snakehead) একটি স্বাদুপানির মাছ। এই প্রজাতিটি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় মাছ। এটি দেখতে শোল মাছের ক্ষুদ্র সংস্করণ। এর দেহ লম্বাটে এবং আঁশযুক্ত। দেহের উপর কিছু ছিট ছিট ফোটা আছে। এদের মুখ কিছুটা বড় এবং ধারালো দাঁত রয়েছে। এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এদের পাওয়া যায়। দেহ লম্বা এবং গোলাকার। সাধারন দৈর্ঘ্য ১৩ সেমি। এবং সর্বাধিক দৈর্ঘ্য ৩২.৫ সেমি। মাথা তুলনা মূলাকভাবে বড়। এটি মিঠা পানির মাছ। সাধারণত নদী, খাল, বিল, পুকুর, এমনকি ডোবা নালা তেও পাওয়া যায়। তবে পুকুর এ ও সহজেই চাষ করা যায়। এটি তেমন একটা চাষ হয় না। তবে চাষ করলে একক চাষ করতে হবে। কারণ মাছটি রাক্ষুসে। অনেক পোনা একসাথে মায়ের সাথে চলাচল করে। খাদ্য হিসেবে টাকি মাছ বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ এ মাছ খেয়ে থাকেন। দোপেয়াজা, ভর্তা, ও ভূনা করে বাংলাদেশে মাছটি খাওয়া হয়।

টেংরা মাছ

টেংরা মাছ

টেংরা মাছ

টেংরা ছোট একটি মাছ। দেহ প্রায় গোলাকার। মুখের সম্মুখে গোঁফ আছে। এদের দেহে আঁইশ নেই তবে দেহ বেশ পিচ্ছিল। টেংরা মাছ আমাদের দেশের অতি পরিচিত মাছগুলোর একটি। এটি মিঠা পানির মাছ। সাধারণত নদী, খাল এবং বিল এ পাওয়া যায়। তবে পুকুরে এ মাছ চাষ করা সম্ভব। এই মাছের তরকারি কিংবা ভর্তা খেতে দারুণ মজা! এই মাছ কর্দমাক্ত ও আগাছাযুক্ত জলাশয়ে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে এই মাছ বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

তেলাপিয়া মাছ

তেলাপিয়া মাছ

তেলাপিয়া মাছ

তেলাপিয়া বা তেলাকই (বৈজ্ঞানিক নাম: Oreochromis mossambicus) একটি মাঝারি আকারের মাছ। মাছটি কে ইংরেজিতে Mozambique tilapia বলে। দেহ চ্যাপ্টা। মাছটি ডিম পাড়ার পর নিজের মুখে রেখে দেয় বাচ্চা ফোটাবার জন্য। শরীর আশযুক্ত। এটি মিঠা পানির মাছ। সাধারণত খাল এবং বিল এ পাওয়া যায়। তবে পুকুর এ ও সহজেই চাষ করা যায়।  মাছ এর চাষ পদ্ধতি খুব সহজ। তবে অধিক ফলনের জন্য বর্তমানে তেলাপিয়া চাষ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশে কিছু নতুন কোম্পানী হয়েছে যারা মাছের খাবার উৎপন্ন করেন। এসব খাবার বা মৎস ফিড দিয়ে এ মাছ চাষ করলে চার মাসে মাছের ওজন ৫০০-৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এতে নিয়মিত খাবার প্রয়োগ ও চিকিৎসক দ্বারা মাছের যত্ন নিতে হয়। তেলাপিয়া গোত্রের নতুন সংযোজন মনোসেক্স যা অধিক ফলনশীল।

পাবদা মাছ

পাবদা মাছ

পাবদা মাছ

আমাদের দেশে নানা প্রজাতির মাছের মধ্যে পাবদা অন্যতম। পাবদা অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুস্বাদু মাছ। বর্তমানে পাবদা মাছ আমাদের দেশে প্রায় বিলুপ্তির পথে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পাবদা মাছরক্ষা করা সম্ভব। পাবদা বা পাবদা মাছ (Ompok pabda) এশিয়া উপ মহাদেশের অমপক গনের বিভিন্ন প্রজাতির মাছেদের বোঝায়। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্য পড়ে Silurus pabda, Callichrous pabda, Wallago pabda।

 

পুঁটি মাছ

পুঁটি মাছ

পুঁটি মাছ

পুঁটি মাছ বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এই মাছ তেলে কড়া ভাবে খেতে চমৎকার, এর দেহ রূপালী ও পিঠের কাছে ধূসরাভ। মাথার কাছে দেহে একটি ধূসরাভ, লালচে পোঁচ দেখা যায়। দৈর্ঘে ১-৩ ইঞ্চি এবং পুকুরে, খালে, বিলে দেখা যায়। এরা মশা ও অন্যান্য কীটের শুককীট ও উদ্ভিজ পদার্থ খেয়ে জীবন ধারণ করে।

 

 

ফলি মাছ

ফলি মাছ

ফলি মাছ

অত্যন্ত চাপা দেহের এই মাছটির স্থানীয় নাম ফইল্লা বা ফলুই। পৃষ্ঠ ও পুচ্ছ পাখনা ছোট, পায়ু পাখনা লম্বা। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬০ সে.মি. হলেও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ৩৬ সে.মি. রেকর্ড করা হয়েছে। শৈবাল, পোকামাকড়, কাদা, বালি খাদ্য হিসেবে গ্রহন করে থাকে। কখনও কখনও ছোট মাছ খেয়ে থাকে। প্রজননের সময় বর্ষাকাল এবং এক প্রজনন ঋতুতে ২৫ সে.মি. লম্বা মা মাছ ৩০০০ টি ডিম দিয়ে থাকে। আগাছা যুক্ত স্থানে বাসা করে ডিম ছাড়ে এবং ডিম আঠালো ও হলুদ রঙের। বাবা ও মা উভয় মাছই ডিম পাহারা দিয়ে থাকে। এই প্রজাতির মাছ বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এছাড়া পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াতেও পাওয়া যায়। আইইউসিএন বাংলাদেশ (২০০০) এর লাল তালিকা অনুযায়ী এই প্রজাতিটি এখনও সংকটাপন্ন প্রাণী হিসাবে চিহ্নিত।

দারকিনা মাছ

দারকিনা মাছ

দারকিনা মাছ

দারকিনা মিঠা পানির অতি প্রাচীন প্রাকৃতিক মাছ। দেশের কোনো জলাশয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে প্রথমেই যে মাছটি মানুষের চোখে পড়ে তার নাম হল দারকিনা। স্থানীয়ভাবে দেশের অনেক স্থানে দারকিনাকে দারখিলা, ডানকানা, ডানখিনা, চুক্কুনি, মলাংকা ইত্যাদি নামে ডাকে। আবহমান বাংলার অতি পরিচিত মাছ এটি। কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায় এর মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত। আছে আইকা। এর আকার লম্বায় এক থেকে দেড় ইঞ্চি। বাঙালির বহুল পরিচিত দৃষ্টিনন্দন ও সুস্বাদু এ মাছ এখন বিলুপ্তির পথে।

তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া (মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে), somewhereinblog.net এবং বাংলাপিডিয়া। 

আরও দেখুনঃ

১। বাংলাদেশের স্বাদুপানির ছোট মাছ পরিচিতি -২

২। বাংলাদেশের স্বাদুপানির ছোট মাছ পরিচিতি -৩

Leave a Reply