প্রসূতি মায়ের পুষ্টি ও পরিচর্যা

বলা হয়ে থাকে, একটি শিশুর যখন জন্ম হয়, তখন জন্ম হয় নতুন এক মায়েরও। নতুন অতিথিকে (শিশুকে) বরণ করে নেয়ার জন্য যেমন একটু বেশিই যত্নের দরকার, তেমনি নতুন মায়ের জন্যও চাই বাড়তি একটুখানি যত্ন। একটি শিশুর জন্ম হলে, আমরা তার ওজন কত হলো এই বিষয় নিয়ে আজকাল খুব মাতামাতি করি। শিশুটির ওজন কম হলে নতুন মাকেও অনেক বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়। কিন্তু আমরা বুঝতে চাই না, মায়ের গর্বে এই শিশুটির পূর্ণাঙ্গ বেড়ে উঠার জন্য প্রয়োজন ছিল গর্ববতী অবস্থায় বিশেষ যত্নের। ইদানীংকালে গর্ববতী মায়েদের যত্ন কিছুটা নেয়া হলেও, প্রসূতি মায়েদের যত্নেরও যে একটা ব্যাপার আছে সেটা আমরা বেমালুম ভুলে যাই। আমরা নতুন শিশুকে মূল্য দিতে জানি, কিন্তু কষ্ট করে নতুন শিশুকে যে এই পৃথিবীর আলো দেখালো সেই প্রসূতি মায়ের পুষ্টি নিয়ে আমাদের ভাবনা কতটুকু?

প্রসূতি মা

নবজাতকের মায়ের বাড়তি যত্ন কেন প্রয়োজন?
সন্তান প্রসবকালীন সময়ে মায়ের শরীরের উপর শারীরিক ও মানসিক অনেক চাপ পড়ে এবং তার দেহের অনেক ঘাটতি দেখা দেয়। নতুন মায়ের দেহের এ ঘাটতিপূরণ, পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিঃরোগ রাখার জন্য গর্ভবতী মায়ের মতো প্রসূতি মাকেও বেশি করে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। শিশুর জন্য মায়ের শাল দুধ প্রথম প্রতিষেধক ও বুকের দুধ পৃথিবীর সেরা পুষ্টিকর খাবার। আমরা জানি, জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খেতে দিতে হবে। কারণ, নবজাতকের জন্য সবচেয়ে ঝুকিমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্যের উৎস হলো মায়ের বুকের দুধ। মায়ের দেহ থেকে বুকের দুধের উপাদান তৈরি হয়। আর, শিশুর জন্য মায়ের বুকে প্রয়োজনীয় দুধ তৈরি হওয়ার জন্য মায়ের অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন হয়। সুতরাং প্রসূতি মায়ের নিজের স্বাস্থ্য ও বুকের দুধ তৈরি করার জন্য মাকে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি সমৃদ্ধ সব ধরনের খাবার খেতে হবে। আসুন, এবার জেনে নেয়া যাক, প্রসূতি মায়ের বাড়তি যত্নের প্রয়োজনীয়তাগুলোঃ

১. ঘাটতিপূরণ, কর্মক্ষমতাবৃদ্ধি ও দুগ্ধ উৎপাদনের জন্যঃ
নবজাতকের মায়ের দেহে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দৈহিক শক্তি ফিরে পেতে শর্করা জাতীয় খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। চাল, আটা, ময়দা,আলু, গুড়, চিনি ইত্যাদি শর্করার উৎস। মায়ের প্রয়োজন অনুসারে শর্করা জাতীয় খাবার মায়ের এবং তার শিশুর শরিীরিক বিকাশে উল্লখযোগ্য ভূমিকা রাখে। প্রসব পরবর্তী সময়ে মায়ের নিজের দেহের ক্ষয়পূরণ ও বুকে দুধ উৎপাদনের জন্য প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। প্রয়োজনীয় প্রোটিন যাতে দৈনিক খাদ্যতালিকা থেকে আসে, এজন্য প্রসূতি মাকে প্রতিদিন প্রোটিন জাতীয় খাবার যথা-মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল ইত্যাদি বেশি করে খেতে হবে। একটি নবজাতকের জন্মের পর, সাধারণত প্রসূতি মায়ের বুকে দৈনিক ২০-৩০ আউন্স দুধ যোগান দেয়। মায়ের বুক, ২ গ্রাম খাদ্য প্রোটিন থেকে ১ গ্রাম দুধের প্রোটিন তৈরি হয়।

প্রাণিজ প্রোটিন মায়ের দুধের উৎকৃষ্ট উপাদান। নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ সরবরাহের লক্ষ্যে, প্রসূতি মাকে দৈনিক ১০০ গ্রাম প্রোটিনের মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ প্রাণিজ প্রোটিন যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি গ্রহণ করা উচিত। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি শিশুকালেই বেশি হয়। মাকে তাই পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে যাতে করে, দুধের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদানগুলো শিশুর দেহের চাহিদা পূরণ করতে পারে। প্রসূতি ও নবজাতক দুইজনের জন্যই ক্যালসিয়াম ও লৌহের প্রয়োজন। এজন্য প্রসূতি মাকে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম ও লৌহসমৃদ্ধ খাবার খেতে দিতে হবে।

২. কোষ্ঠকাঠিন্য রোধেঃ
নতুন মায়েরা প্রায় সময়ই কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগে থাকেন। এজন্য বেশি পরিমানে আঁশযুক্ত খাবার যেমনঃ কচুশাক, সজনে, কলার মোচা, ঢেঁড়স, ডাটা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, শিম, পটল, কচু, বেগুন, বরবটি, মটরশুঁটি, কলমিশাক, পুদিনা পাতা, পুঁইশাক, মূলাশাক, ডাটাশাক, লাউয়ের পাতা ও মিষ্টি কুমড়ার শাক খাওয়া উচিত।

৩. রক্তশূন্যতা রোধেঃ
সন্তান জন্মদানের সময় মায়েদের অনেক রক্তপাত হয়ে থাকে। অনেকে রক্তশূন্যতায় ভুগে থাকেন। রক্তের এ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে, মায়েদের আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ও প্রচুর শাকসবজি বিশেষত পালংশাক, কচুশাক খাওয়া উচিত। কারণ এতে রয়েছে ভিটামিন এ, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, যা নতুন রক্ত কোষ তৈরি করে।

৪. পানিশূন্যতা রোধেঃ
প্রসূতি মা যখন শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তখন তার শরীর থেকে প্রতিদিন অনেক পানি বের হয়ে যায়। বাচ্চা প্রতিদিন যে পরিমাণে মায়ের দুধ খায় অন্তত সেই পরিমাণ পানি জাতীয় খাবার প্রসূতি মায়ের শরীরে ফিরিয়ে দেয়া উচিত। এছাড়া রসালো ফলমূল এবং বেশি করে ঝোল দিয়ে রান্না করা মাছের তরকারিও বেশ উপকারী।

কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া, খাদ্যের জন্য প্রতিটা নবজাতক মায়ের বুকের দুধের উপরই নির্ভরশীল। মা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খেলে তবেই না মা, নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় দুধের যোগান দিতে পারবে। একথাটি ভুলে গেলে চলবে না। এজন্যই নবজাতকের মা কে প্রয়োজনীয় পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খেতে দিয়ে, বিশ্রাম নিতে দিয়ে, নবজাতকের সেবা করার সুযোগ দিতে হবে। যাতে করে একটি সুস্থ্য-সুন্দর আগামী উপহার দিতে পারেন।

মোঃ আলমগীর কবীর
বি.এসসি এবং এম.এ্স,
খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ,
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply