গল্পঃ ছুটি -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

ছুটি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বালকদিগের সর্দার ফটিক চক্রবর্তীর মাথায় চট্ করিয়া একটা নূতন ভাবোদয় হইল, নদীর ধারে একটা প্রকাণ্ড শালকাষ্ঠ মাস্তুলে রূপান্তরিত হইবার প্রতীক্ষায় পড়িয়া ছিল ; স্থির হইল, সেটা সকলে মিলিয়া গড়াইয়া লইয়া যাইবে।

যে ব্যক্তির কাঠ আবশ্যক-কালে তাহার যে কতখানি বিস্ময় বিরক্তি এবং অসুবিধা বোধ হইবে, তাহাই উপলব্ধি করিয়া বালকেরা এ প্রস্তাবে সম্পূর্ণ অনুমোদন করিল ।

কোমর বাঁধিয়া সকলেই যখন মনোযোগের সহিত কার্যে প্রবৃত্ত হইবার উপক্রম করিতেছে এমন সময়ে ফটিকের কনিষ্ঠ মাখনলাল গম্ভীরভাবে সেই গুঁড়ির উপরে গিয়া বসিল ; ছেলেরা তাহার এইরূপ উদার ঔদাসীন্য দেখিয়া কিছু বিমর্ষ হইয়া গেল ।

একজন আসিয়া ভয়ে ভয়ে তাহাকে একটু-আধটু ঠেলিল কিন্ত সে তাহাতে কিছুমাত্র বিচলিত হইল না; এই অকাল-তত্ত্বজ্ঞানী মানব সকলপ্রকার ক্রীড়ার অসারতা সম্বন্ধে নীরবে চিন্তা করিতে লাগিল ।

ফটিক আসিয়া আস্ফালন করিয়া কহিল, “ দেখ্‌, মার খাবি। এইবেলা ওঠ্‌ । ”

সে তাহাতে আরো একটু নড়িয়াচড়িয়া আসনটি বেশ স্থায়ীরূপে দখল করিয়া লইল ।

এরূপ স্থলে সাধারণের নিকট রাজসম্মান রক্ষা করিতে হইলে অবাধ্য ভ্রাতার গন্ডদেশে অনতিবিলম্বে এক চড় কষাইয়া দেওয়া ফটিকের কর্তব্য ছিল — সাহস হইল না । কিন্তু, এমন একটা ভাব ধারণ করিল , যেন ইচ্ছা করিলেই এখনই উহাকে রীতিমত শাসন করিয়া দিতে পারে কিন্তু করিল না; কারণ, পূর্বাপেক্ষা আর-একটা ভালো খেলা মাথায় উদয় হইয়াছে , তাহাতে আর-একটু বেশি মজা আছে । প্রস্তাব করিল , মাখনকে সুদ্ধ ঐ কাঠ গড়াইতে আরম্ভ করা যাক ।

মাখন মনে করিল , ইহাতে তাহার গৌরব আছে ; কিন্তু অন্যান্য পার্থিব গৌরবের ন্যায় ইহার আনুষঙ্গিক যে বিপদের সম্ভাবনাও আছে , তাহা তাহার কিংবা আর-কাহারো মনে উদয় হয় নাই ।

ছেলেরা কোমর বাঁধিয়া ঠেলিতে আরম্ভ করিল — ‘ মারো ঠেলা হেঁইয়ো , সাবাস জোয়ান হেঁইয়ো । ‘ গুঁড়ি একপাক ঘুরিতে-না ঘুরিতেই মাখন তাহার গাম্ভীর্য গৌরব এবং তত্ত্বজ্ঞান সমেত ভূমিসাৎ হইয়া গেল ।

খেলার আরম্ভেই এইরূপ আশাতীত ফললাভ করিয়া অন্যান্য বালকেরা বিশেষ হৃষ্ট হইয়া উঠিল , কিন্তু ফটিক কিছু শশব্যস্ত হইল । মাখন তৎক্ষণাৎ ভূমিশয্যা ছাড়িয়া ফটিকের উপরে গিয়া পড়িল, একেবারে অন্ধভাবে মারিতে লাগিল । তাহার নাকে মুখে আঁচড় কাটিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে গৃহাভিমুখে গমন করিল । খেলা ভাঙিয়া গেল ।

ফটিক গোটাকতক কাশ উৎপাটন করিয়া লইয়া একটা অর্ধনিমগ্ন নৌকার গলুইয়ের উপরে চড়িয়া বসিয়া চুপচাপ করিয়া কাশের গোড়া চিবাইতে লাগিল ।

এমনসময় একটা বিদেশী নৌকা ঘাটে আসিয়া লাগিল । একটি অর্ধবয়সী ভদ্রলোক কাঁচা গোঁফ এবং পাকা চুল লইয়া বাহির হইয়া আসিলেন । বালককে জিজ্ঞাসা করিলেন , “ চক্রবর্তীদের বাড়ি কোথায় । ”

বালক ডাঁটা চিবাইতে চিবাইতে কহিল , “ ঐ হোথা । ” কিন্তু কোন্‌দিকে যে নির্দেশ করিল, কাহারো বুঝিবার সাধ্য রহিল না ।

ভদ্রলোকটি আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “ কোথা । ”

সে বলিল, “ জানি নে । ” বলিয়া পূর্ববৎ তৃণমূল হইতে রসগ্রহণে প্রবৃত্ত হইল । বাবুটি তখন অন্য লোকের সাহায্য অবলম্বন করিয়া চক্রবর্তীদের গৃহের সন্ধানে চলিলেন ।

অবিলম্বে বাঘা বাগদি আসিয়া কহিল , “ ফটিকদাদা , মা ডাকছে । ”

ফটিক কহিল , “ যাব না । ”

বাঘা তাহাকে বলপূর্বক আড়কোলা করিয়া তুলিয়া লইয়া গেল; ফটিক নিষ্ফল আক্রোশে হাত পা ছুঁড়িতে লাগিল ।

ফটিককে দেখিবামাত্র তাহার মা অগ্নিমূর্তি হইয়া কহিলেন , “ আবার তুই মাখনকে মেরেছিস! ”

ফটিক কহিল , “ না , মারি নি । ”

“ ফের মিথ্যে কথা বলছিস! ”

“ কখ্‌খনো মারি নি । মাখনকে জিজ্ঞাসা করো । ”

মাখনকে প্রশ্ন করাতে মাখন আপনার পূর্ব নালিশের সমর্থন করিয়া বলিল , “ হাঁ , মেরেছে । ”

তখন আর ফটিকের সহ্য হইল না । দ্রুত গিয়া মাখনকে এক সশব্দ চড় কষাইয়া দিয়া কহিল , “ ফের মিথ্যে কথা! ”

মা মাখনের পক্ষ লইয়া ফটিককে সবেগে নাড়া দিয়া তাহার পৃষ্ঠে দুটা-তিনটা প্রবল চপেটাঘাত করিলেন । ফটিক মাকে ঠেলিয়া দিল ।

মা চীৎকার করিয়া কহিলেন , “ অ্যাঁ , তুই আমার গায়ে হাত তুলিস! ”

এমন সময়ে সেই কাঁচাপাকা বাবুটি ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন , “ কী হচ্ছে তোমাদের । ”

ফটিকের মা বিস্ময়ে আনন্দে অভিভূত হইয়া কহিলেন , “ ওমা , এ যে দাদা , তুমি কবে এলে । ” বলিয়া গড় করিয়া প্রণাম করিলেন ।

বহুদিন হইল দাদা পশ্চিমে কাজ করিতে গিয়াছিলেন, ইতিমধ্যে ফটিকের মার দুই সন্তান হইয়াছে , তাহারা অনেকটা বাড়িয়া উঠিয়াছে , তাহার স্বামীর মৃত্যু হইয়াছে , কিন্তু একবারও দাদার সাক্ষাৎ পায় নাই । আজ বহুকাল পরে দেশে ফিরিয়া আসিয়া বিশ্বম্ভরবাবু তাঁহার ভগিনীকে দেখিতে আসিয়াছেন ।

কিছুদিন খুব সমারোহে গেল । অবশেষে বিদায় লইবার দুই-একদিন পূর্বে বিশ্বম্ভরবাবু তাঁহার ভগিনীকে ছেলেদের পড়াশুনা এবং মানসিক উন্নতি সম্বন্ধে প্রশ্ন করিলেন । উত্তরে ফটিকের অবাধ্য উচ্ছৃঙ্খলতা , পাঠে অমনোযোগ , এবং মাখনের সুশান্ত সুশীলতা ও বিদ্যানুরাগের বিবরণ শুনিলেন ।

তাঁহার ভগিনী কহিলেন , “ ফটিক আমার হাড় জ্বালাতন করিয়াছে । ”

শুনিয়া বিশ্বম্ভর প্রস্তাব করিলেন , তিনি ফটিককে কলিকাতায় লইয়া গিয়া নিজের কাছে রাখিয়া শিক্ষা দিবেন ।

বিধবা এ প্রস্তাবে সহজেই সম্মত হইলেন ।

ফটিককে জিজ্ঞাসা করিলেন , “ কেমন রে ফটিক , মামার সঙ্গে কলকাতায় যাবি ? ”

ফটিক লাফাইয়া উঠিল বলিল , “ যাব । ”

যদিও ফটিককে বিদায় করিতে তাহার মায়ের আপত্তি ছিল না , কারণ তাঁহার মনে সর্বদাই আশঙ্কা ছিল — কোন্‌দিন সে মাখনকে জলেই ফেলিয়া দেয় কি মাথাই ফাটায় কি কী একটা দুর্ঘটনা ঘটায় , তথাপি ফটিকের বিদায়গ্রহণের জন্য এতাদৃশ আগ্রহ দেখিয়া তিনি ঈষৎ ক্ষুণ্ন হইলেন ।

‘ কবে যাবে ‘, ‘ কখন্‌ যাবে ‘ করিয়া ফটিক তাহার মামাকে অস্থির করিয়া তুলিল ; উৎসাহে তাহার রাত্রে নিদ্রা হয় না ।

অবশেষে যাত্রাকালে আনন্দের ঔদার্য-বশত তাহার ছিপ ঘুড়ি লাটাই সমস্ত মাখনকে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে ভোগদখল করিবার পুরা অধিকার দিয়া গেল ।

কলিকাতায় মামার বাড়ি পৌঁছিয়া প্রথমত মামির সঙ্গে আলাপ হইল । মামি এই অনাবশ্যক পরিবারবৃদ্ধিতে মনে মনে যে বিশেষ সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন তাহা বলিতে পারি না । তাঁহার নিজের তিনটি ছেলে লইয়া তিনি নিজের নিয়মে ঘরকন্না পাতিয়া বসিয়া আছেন , ইহার মধ্যে সহসা একটি তেরো বৎসরের অপরিচিত অশিক্ষিত পাড়াগেঁয়ে ছেলে ছাড়িয়া দিলে কিরূপ একটা বিপ্লবের সম্ভাবনা উপস্থিত হয় । বিশ্বম্ভরের এত বয়স হইল , তবু কিছুমাত্র যদি জ্ঞানকাণ্ড আছে ।

বিশেষত , তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই । শোভাও নাই , কোনো কাজেও লাগে না । স্নেহও উদ্রেক করে না , তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে । তাহার মুখে আধে-আধো কথাও ন্যাকামি , পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্‌ভতা । হঠাৎ কাপড়চোপড়ের পরিমাণ রক্ষা না করিয়া বেমানানরূপে বাড়িয়া উঠে ; লোকে সেটা তাহার একটা কুশ্রী স্পর্ধাস্বরূপ জ্ঞান করে । তাহার শৈশবের লালিত্য এবং কণ্ঠস্বরের মিষ্টতা সহসা চলিয়া যায়; লোকে সেজন্য তাহাকে মনে মনে অপরাধ না দিয়া থাকিতে পারে না । শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা যায় , কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয় ।

সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে , পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না ; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে । অথচ এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায় । এই সময়ে যদি সে কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নিকট হইতে স্নেহ কিংবা সখ্য লাভ করিতে পারে তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত হইয়া থাকে । কিন্তু তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ সাহস করে না; কারণ সেটা সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে । সুতরাং তাহার চেহারা এবং ভাবখানা অনেকটা প্রভুহীন পথের কুকুরের মতো হইয়া যায় ।

অতএব , এমন অবস্থায় মাতৃভবন ছাড়া আর-কোনো অপরিচিত স্থান বালকের পক্ষে নরক । চারি দিকের স্নেহশূন্য বিরাগ তাহাকে পদে পদে কাঁটার মতো বিঁধে । এই বয়সে সাধারণত নারীজাতিকে কোনো-এক শ্রেষ্ঠ স্বর্গলোকের দুর্লভ জীব বলিয়া মনে ধারণা হইতে আরম্ভ হয় , অতএব তাঁহাদের নিকট হইতে উপেক্ষা অত্যন্ত দুঃসহ বোধ হয় ।

মামির স্নেহহীন চক্ষে সে যে একটা দুর্গ্রহের মতো প্রতিভাত হইতেছে , এইটে ফটিকের সবচেয়ে বাজিত । মামি যদি দৈবাৎ তাহাকে কোনো-একটা কাজ করিতে বলিতে , তাহা হইলে সে মনের আনন্দে যতটা আবশ্যক তার চেয়ে বেশি কাজ করিয়া ফেলিত — অবশেষে মামি যখন তাহার উৎসাহ দমন করিয়া বলিতেন , “ ঢের হয়েছে , ঢের হয়েছে । ওতে আর তোমায় হাত দিতে হবে না । এখন তুমি নিজের কাজে মন দাওগে । একটু পড়োগে যাও । ”— তখন তাহার মানসিক উন্নতির প্রতি মামির এতটা যত্নবাহুল্য তাহার অত্যন্ত নিষ্ঠুর অবিচার বলিয়া মনে হইত ।

ঘরের মধ্যে এইরূপ অনাদর , ইহার পর আবার হাঁফ ছাড়িবার জায়গা ছিল না । দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়িয়া কেবলই তাহার সেই গ্রামের কথা মনে পড়িত ।

প্রকাণ্ড একটা ধাউস ঘুড়ি লইয়া বোঁ বোঁ শব্দে উড়াইয়া বেড়াইবার সেই মাঠ , ‘ তাইরে নাইরে নাইরে না ‘ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে স্বরচিত রাগিণী আলাপ করিয়া অকর্মণ্যভাবে ঘুরিয়া বেড়াইবার সেই নদীতীর , দিনের মধ্যে যখন-তখন ঝাঁপ দিয়া পড়িয়া সাঁতার কাটিবার সেই সংকীর্ণ স্রোতস্বিনী , সেই-সব দল-বল উপদ্রব স্বাধীনতা, এবং সর্বোপরি সেই অত্যাচারিণী অবিচারিণী মা অহর্নিশি তাহার নিরুপায় চিত্তকে আকর্ষণ করিত ।

জন্তুর মতো একপ্রকার অবুঝ ভালোবাসা — কেবল একটা কাছে যাইবার অন্ধ ইচ্ছা , কেবল একটা না দেখিয়া অব্যক্ত ব্যাকুলতা , গোধূলিসময়ের মাতৃহীন বৎসের মতো কেবল একটা আন্তরিক ‘ মা মা ‘ ক্রন্দন — সেই লজ্জিত শঙ্কিত শীর্ণ দীর্ঘ অসুন্দর বালকের অন্তরে কেবলই আলোড়িত হইত ।

স্কুলে এতবড়ো নির্বোধ এবং অমনোযোগী বালক আর ছিল না । একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলে সে হাঁ করিয়া চাহিয়া থাকিত । মাস্টার যখন মার আরম্ভ করিত তখন ভারক্লান্ত গর্দভের মতো নীরবে সহ্য করিত । ছেলেদের যখন খেলিবার ছুটি হইত তখন জানালার কাছে দাঁড়াইয়া দূরের বাড়িগুলার ছাদ নিরীক্ষণ করিত ; যখন সেই দ্বিপ্রহর-রৌদ্রে কোনো-একটা ছাদে দুটি-একটি ছেলেমেয়ে কিছু-একটা খেলার ছলে ক্ষণেকের জন্য দেখা দিয়া যাইত তখন তাহার চিত্ত অধীর হইয়া উঠিত ।

একদিন অনেক প্রতিজ্ঞা করিয়া অনেক সাহসে মামাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল , “ মামা , মার কাছে কবে যাব । ” মামা বলিয়াছিলেন , “ স্কুলের ছুটি হোক । ”

কার্তিক মাসে পূজার ছুটি , সে এখনো ঢের দেরি ।

একদিন ফটিক তাহার স্কুলের বই হারাইয়া ফেলিল । একে তো সহজেই পড়া তৈরি হয় না , তাহার পর বই হারাইয়া একেবারে নাচার হইয়া পড়িল । মাস্টার প্রতিদিন তাহাকে অত্যন্ত মারধোর অপমান করিতে আরম্ভ করিলেন । স্কুলে তাহার এমন অবস্থা হইল যে , তাহার মামাতো ভাইরা তাহার সহিত সম্বন্ধ স্বীকার করিতে লজ্জা বোধ করিত । ইহার কোনো অপমানে তাহারা অন্যান্য বালকের চেয়েও যেন বলপূর্বক বেশি করিয়া আমোদ প্রকাশ করিত ।

অসহ্য বোধ হওয়াতে একদিন ফটিক তাহার মামির কাছে নিতান্ত অপরাধীর মতো গিয়া কহিল , “ বই হারিয়ে ফেলেছি । ”

মামি অধরের দুই প্রান্তে বিরক্তির রেখা অঙ্কিত করিয়া বলিলেন , “ বেশ করেছ! আমি তোমাকে মাসের মধ্যে পাঁচবার করে বই কিনে দিতে পারি নে । ”

ফটিক আর-কিছু না বলিয়া চলিয়া আসিল — সে যে পরের পয়সা নষ্ট করিতেছে , এই মনে করিয়া তাহার মায়ের উপর অত্যন্ত অভিমান উপস্থিত হইল ; নিজের হীনতা এবং দৈন্য তাহাকে মাটির সহিত মিশাইয়া ফেলিল ।

স্কুল হইতে ফিরিয়া সেই রাত্রে তাহার মাথাব্যথা করিতে লাগিল এবং গা সির‌্সির্‌ করিয়া আসিল । বুঝিতে পারিল, তাহার জ্বর আসিতেছে । বুঝিতে পারিল, ব্যামো বাধাইলে তাহার মামির প্রতি অত্যন্ত অনর্থক উপদ্রব করা হইবে । মামি এই ব্যামোটাকে যে কিরূপ একটা অকারণ অনাবশ্যক জ্বালাতনের স্বরূপ দেখিবে তাহা সে স্পষ্ট উপলব্ধি করিতে পারিল । রোগের সময় এই অকর্মণ্য অদ্ভুত নির্বোধ বালক পৃথিবীতে নিজের মা ছাড়া আর-কাহারো কাছে সেবা পাইতে পারে , এরূপ প্রত্যাশা করিতে তাহার লজ্জা বোধ হইতে লাগিল ।

পরদিন প্রাতঃকালে ফটিককে আর দেখা গেল না । চতুর্দিকে প্রতিবেশীদের ঘরে খোঁজ করিয়া তাহার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না ।

সেদিন আবার রাত্রি হইতে মুষলধারে শ্রাবণের বৃষ্টি পড়িতেছে । সুতরাং তাহার খোঁজ করিতে লোকজনকে অনর্থক অনেক ভিজিতে হইল । অবশেষে কোথাও না পাইয়া বিশ্বম্ভরবাবু পুলিসে খবর দিলেন ।

সমস্ত দিনের পর সন্ধ্যার সময় একটা গাড়ি আসিয়া বিশ্বম্ভরবাবুর বাড়ির সম্মুখে দাঁড়াইল । তখনো ঝুপ্‌ ঝুপ্‌ করিয়া অবিশ্রাম বৃষ্টি পড়িতেছে , রাস্তায় এক-হাঁটু জল দাঁড়াইয়া গিয়াছে ।

দুইজন পুলিসের লোক গাড়ি হইতে ফটিককে ধরাধরি করিয়া নামাইয়া বিশ্বম্ভরবাবুর নিকট উপস্থিত করিল । তাহার আপাদমস্তক ভিজা , সর্বাঙ্গে কাদা , মুখ চক্ষু লোহিতবর্ণ , থর্ থর্ করিয়া কাঁপিতেছে । বিশ্বম্ভরবাবু প্রায় কোলে করিয়া তাহাকে অন্তঃপুরে লইয়া গেলেন ।

মামি তাহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিলেন , “ কেন বাপু , পরের ছেলেকে নিয়ে কেন এ কর্মভোগ । দাও ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও । ”

বাস্তবিক , সমস্তদিন দুশ্চিন্তায় তাঁহার ভালোরূপ আহারাদি হয় নাই এবং নিজের ছেলেদের সহিতও নাহক অনেক খিট্‌মিট্‌ করিয়াছেন ।

ফটিক কাঁদিয়া উঠিয়া কহিল , “ আমি মার কাছে যাচ্ছিলুম , আমাকে ফিরিয়ে এনেছে । ”

বালকের জ্বর অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল । সমস্ত রাত্রি প্রলাপ বকিতে লাগিল । বিশ্বম্ভরবাবু চিকিৎসক লইয়া আসিলেন ।

ফটিক তাহার রক্তবর্ণ চক্ষু একবার উন্মীলিত করিয়া কড়িকাঠের দিকে হতবুদ্ধিভাবে তাকাইয়া কহিল , “ মামা , আমার ছুটি হয়েছে কি । ”

বিশ্বম্ভরবাবু রুমালে চোখ মুছিয়া সস্নেহে ফটিকের শীর্ণ তপ্ত হাতখানি হাতের উপর তুলিয়া লইয়া তাহার কাছে আসিয়া বসিলেন ।

ফটিক আবার বিড়্ বিড়্ করিয়া বকিতে লাগিল; বলিল , “ মা , আমাকে মারিস্‌ নে মা । সত্যি বলছি , আমি কোনো দোষ করি নি । ”

পরদিন দিনের বেলা কিছুক্ষণের জন্য সচেতন হইয়া ফটিক কাহার প্রত্যাশায় ফ্যাল্‌ফ্যাল্‌ করিয়া ঘরের চারি দিকে চাহিল । নিরাশ হইয়া আবার নীরবে দেয়ালের দিকে মুখ করিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল ।

বিশ্বম্ভরবাবু তাহার মনের ভাব বুঝিয়া তাহার কানের কাছে মুখ নত করিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন , “ ফটিক , তোর মাকে আনতে পাঠিয়েছি । ”

তাহার পরদিনও কাটিয়া গেল । ডাক্তার চিন্তিত বিমর্ষ মুখে জানাইলেন , অবস্থা বড়োই খারাপ ।

বিশ্বম্ভরবাবু স্তিমিতপ্রদীপে রোগশয্যায় বসিয়া প্রতিমুহূর্তেই ফটিকের মাতার জন্য প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন ।

ফটিক খালাসিদের মতো সুর করিয়া করিয়া বলিতে লাগিল , “ এক বাঁও মেলে না । দো বাঁও মেলে — এ — এ না । ” কলিকাতায় আসিবার সময় কতকটা রাস্তা স্টীমারে আসিতে হইয়াছিল , খালাসিরা কাছি ফেলিয়া সুর করিয়া জল মাপিত ; ফটিক প্রলাপে তাহাদেরই অনুকরণে করুণস্বরে জল মাপিতেছে এবং যে অকূল সমুদ্রে যাত্রা করিতেছে , বালক রশি ফেলিয়া কোথাও তাহার তল পাইতেছে না ।

এমন সময়ে ফটিকের মাতা ঝড়ের মতো ঘরে প্রবেশ করিয়াই উচ্চকলরবে শোক করিতে লাগিলেন । বিশ্বম্ভর বহুকষ্টে তাঁহার শোকোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত করিলে , তিনি শয্যার উপর আছাড় খাইয়া পড়িয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকিলেন , “ ফটিক! সোনা! মানিক আমার! ”

ফটিক যেন অতি সহজেই তাহার উত্তর দিয়া কহিল , “ অ্যাঁ । ”

মা আবার ডাকিলেন , “ ওরে ফটিক , বাপধন রে! ”

ফটিক আস্তে আস্তে পাশ ফিরিয়া কাহাকেও লক্ষ্য না করিয়া মৃদুস্বরে কহিল , “ মা , এখন আমার ছুটি হয়েছে মা , এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি । ”

-সমাপ্ত-

Leave a Reply